রাজনৈতিক প্রস্তাব

গণসংহতি আন্দোলনের এই রাজনৈতিক প্রস্তাবটি ধীরে ধরে দলীয় আলোচনা ও সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে পরিমার্জিত হয়েছে। সাম্প্রতিক জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শক্তি বিতাড়িত হওয়ার পর এখন দাঁড়িয়ে আমরা এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে। পুরনো স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো কি আবার ফিরে আসবে, নাকি আমরা গড়ে তুলব এক নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই প্রস্তাব।

প্রস্তাবের শুরুর অংশে ফিরে তাকানো হয়েছে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ভোটারবিহীন ও ভোটডাকাতির নির্বাচনের দিকে। সেই সময় আওয়ামী লীগ সরকার এক চরম কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছিল। এক ব্যক্তির হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে গুম, খুন, অপহরণ, নারী নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস আর লাগামহীন অর্থনৈতিক লুণ্ঠন নাগরিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। সাধারণ মানুষ সমালোচনা করতে ভয় পেত, আর গুটিকতক লুটেরা বানিয়েছিল লুণ্ঠনের স্বর্গরাজ্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ন্যায়বিচার সবকিছু ভেঙে পড়েছিল। এটা কিন্তু কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই যে কেন্দ্রীয় ও স্বৈরতান্ত্রিক সাংবিধানিক কাঠামো বিদ্যমান—তারই চূড়ান্ত পরিণতি। ১৯৭২ সালে কোনো নিরপেক্ষ সংবিধান সভা ছাড়াই দলীয় সংসদের মাধ্যমে সেই সংবিধান পাস হয়েছিল, যার ভিত্তিতে পরে বারবার সামরিক শাসন আর তথাকথিত গণতন্ত্রের নামে দলীয় একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কিন্তু সেই ফ্যাসিবাদ এখন অতীত। জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানে তা বিতাড়িত হয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই: আমরা কি পুরনো সেই একই কাঠামোতে ফিরে যাব? নাকি সত্যিকার অর্থে গড়ে তুলব একটি জবাবদিহিতাপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র?

এই প্রস্তাবের উত্তর স্পষ্ট: শুধু নির্বাচন দিয়ে হবে না। কেননা যেই সাংবিধানিক কাঠামো বারবার স্বৈরতন্ত্র তৈরি করেছে, সেটা অপরিবর্তিত রেখে শুধু সরকার বদল মানে ঘুরেফিরে একই জায়গায় আসা। তাই প্রস্তাব করা হয়েছে—প্রয়োজন একটি নতুন সংবিধান সভা। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে, সকল পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে রচনা করতে হবে নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান। যেখানে থাকবে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনসহ সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া, রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের ক্ষমতার পৃথকীকরণ, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা, সংবিধানের কুখ্যাত ৭০ অনুচ্ছেদের বিলোপ, প্রকৃত ক্ষমতাসম্পন্ন স্থানীয় সরকার, আর নাগরিকদের মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আইনি নিশ্চয়তা।

একই সঙ্গে প্রস্তাবে বলা হয়েছে জরুরি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের কথাও—দুর্নীতি বন্ধ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, শ্রমিকের মজুরি, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃভাষায় শিক্ষা, প্রবাসীদের ভোটাধিকার আর প্রকৃতিবান্ধব উন্নয়ন।

প্রস্তাবটি এ-ও মনে করিয়ে দেয় যে, শুধু ফ্যাসিবাদের পতন চূড়ান্ত বিজয় নয়—এটা কেবল শুরু। এখন সময় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার, রাষ্ট্র বদলের সংগ্রামে। পুরনো অগণতান্ত্রিক কাঠামো ভাঙার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে জনগণের বাংলাদেশ।

অতএব, ফ্যাসিবাদ পতনের পর এখন রাজপথ থেকে সংসদ পর্যন্ত—সব জায়গায় এগিয়ে নিতে হবে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দাবি। নতুন সংবিধান সভা চাই। নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাই।

সম্পূর্ণ ডকুমেন্ট অনলাইনে পড়ুন অথবা ডাউনলোড করুন