নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গণসংহতি আন্দোলন তাদের ইশতেহার হাজির করেছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক মোড়ে। ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর জুলাই গণঅভ্যুত্থান নতুন এক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন না হলে নতুন করে আবার পুরনো চক্রে ফিরে যাওয়ার শঙ্কাও কম নয়। এই ইশতেহার তাই শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়—এটি রাষ্ট্র ও সমাজের আমূল পুনর্গঠনের রূপরেখা, একটি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারপত্র।

২০২৬ সালের এই নির্বাচনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ এটা শুধু সংসদ নির্বাচন নয়, একই সঙ্গে এটি হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের নির্বাচন। ফ্যাসিবাদী শাসনের আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি ধ্বংস করতে এবং নতুন করে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো দাঁড় করাতে এই সংস্কার পরিষদের ভূমিকা হবে নির্ণায়ক। ইশতেহারে তাই একদিকে যেমন রয়েছে জুলাই সনদের আলোকে সাংবিধানিক সংস্কারের অঙ্গীকার, অন্যদিকে তেমনি বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, নগরায়ন, প্রকৃতি ও সংস্কৃতিতে কী ধরনের রূপান্তর দরকার।

ইশতেহারের শুরুতেই গণসংহতি আন্দোলন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি-তে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের বাইরে তাদের আর কোনো স্বার্থ নেই। তারা চায় এমন একটি দেশ যেখানে তরুণ নিজের মতো উদ্যোক্তা হতে পারে, শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পায়, কৃষক তার পণ্যের দাম পায়, নারী নিরাপদ থাকে, আর প্রতিটি নাগরিক পায় মানসম্মত চিকিৎসা ও শিক্ষা। কোনো মা-বাবাকে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে হবে না—এটাই তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ।

এই লক্ষ্য পূরণে ইশতেহারের মূল ভিত্তি হচ্ছে গণতান্ত্রিক সংস্কার। জুলাই সনদের মাধ্যমে ইতিমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে—তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হয়েছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার আইনি ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দশ বছরে সীমিত করা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের মতপ্রকাশের অধিকার (অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া) নিশ্চিত হয়েছে, এবং বাংলাদেশকে বহুজাতিক দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পথ খোলা হয়েছে। গণসংহতি আন্দোলন অঙ্গীকার করছে যে এই সংস্কারগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং আরও গভীর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সংগ্রাম তারা চালিয়ে যাবে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গণতন্ত্রায়ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতির চর্চা ছাড়া কেবল সাংবিধানিক সংস্কার যথেষ্ট নয়।

কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ইশতেহার বলছে, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করলেই দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরি হবে, আর সেই চাহিদা মেটাতেই গড়ে উঠবে নতুন শিল্প, তৈরি হবে বিপুল কর্মসংস্থান। ফ্রিল্যান্সিং, কারিগরি শিক্ষা, প্রবাসী কর্মীদের জন্য দেশভিত্তিক প্রশিক্ষণ সেল, জিটুজি চুক্তি, রিক্রুটিং এজেন্টদের স্বচ্ছতা, প্রবাসীদের বাধ্যতামূলক বীমা—এসব প্রস্তাব রয়েছে। দেশের যুবশক্তি যাতে অপচয় না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র বাড়ানো, কৃষি সমবায়ের মাধ্যমে কৃষকের বাজার তৈরি, সিন্ডিকেট ভাঙতে আমদানি নীতি উন্মুক্ত করা, সেন্ট্রাল ডাটা সিস্টেমের মাধ্যমে উৎপাদন ও চাহিদার তথ্য হালনাগাদ রাখা—ইশতেহারে এসব বাস্তবসম্মত প্রস্তাব আছে।

দুর্নীতি ও অপচয় রোধে দুদককে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা, ব্যাংক খাতে জমিদারি সুলভ কর্তৃত্ব বন্ধ, ই-টেন্ডার বাধ্যতামূলক, সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহি ও মেধাভিত্তিক পদোন্নতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্য উন্মুক্তকরণ, এক টেবিল সেবা চালু, তথ্যদাতার আইনি সুরক্ষা—এসব প্রস্তাবের মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সংস্কার ইশতেহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৮৬১ সালের ঔপনিবেশিক পুলিশ আইন বাতিল করে নতুন যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিচার, পুলিশ কমিশন গঠন, নিয়োগ-পদোন্নতিতে স্বচ্ছ পরীক্ষা পদ্ধতি চালু, ভারী অস্ত্র ব্যবহার সীমিত করা, রাজনৈতিক সভায় পুলিশের অনুমতির বদলে শুধু অবগতির আইন—এসব প্রস্তাবের মাধ্যমে পুলিশকে জনগণের বন্ধু ও পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখা হয়েছে।

পররাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তায় জোটনিরপেক্ষ নীতির পুনর্ব্যাখ্যা করে ইশতেহার বলছে, জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখে সবার সাথে সমমর্যাদার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক নদী চুক্তি থেকে পানি প্রত্যাহার বন্ধে কঠোর অবস্থান, প্রতিবেশী ও অন্যান্য দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বিষয় সমাধানে স্বার্থ ছাড় না দেওয়া, এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতা নয় বরং অর্থনীতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

শিক্ষা সংস্কার ইশতেহারের অগ্রাধিকার। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় খাতে মানসম্মত বিনামূল্যে শিক্ষা, শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল ও প্রশিক্ষণ, শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ, কারিগরি ও বিশেষায়িত শিক্ষার বিস্তার, জাতীয় অনুবাদ সংস্থা গঠন করে মাতৃভাষায় বিশ্বমানের শিক্ষা, পাঠ্যপুস্তকে উপনিবেশিক ও ফ্যাসিবাদী আদর্শ বর্জন, শিক্ষা পরিচালনায় আমলাতন্ত্রের হাত থেকে শিক্ষকদের স্বাধীনতা, প্রতিটি বিদ্যালয়ে লাইব্রেরি ও ল্যাব, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাকে অগ্রাধিকার—এসব প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন ও সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গবেষণা, প্রবাসী বিজ্ঞানীদের দেশে ফেরার ক্ষেত্র তৈরি, আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন, তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার হাব প্রতিষ্ঠা, এবং সর্বোপরি বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাধারার বিকাশের কথা বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্যনীতির মূলমন্ত্র ‘বিনা চিকিৎসায় কেউ মারা যাবে না’। সর্বজনীন স্বাস্থ্যকার্ড চালু, স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ৫ ভাগ বরাদ্দ, সরকারি হাসপাতালের মানোন্নয়ন, গ্রাম ও দুর্গম এলাকায় ডাক্তার ও নার্সের উপস্থিতি নিশ্চিতে পদোন্নতির অগ্রাধিকার, বেসরকারি হাসপাতালের মূল্য তালিকা বাধ্যতামূলক, ওষুধের দাম ও মান নিয়ন্ত্রণ, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যে বিশেষ মনোযোগ, দেশীয় চিকিৎসাপদ্ধতির আধুনিকায়ন—এই সব প্রস্তাব স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।

কৃষি আধুনিকায়নে ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র, কৃষিপণ্য মূল্য কমিশন, ঋণ ও ভর্তুকি, শস্যবীমা, ভূমি সংস্কার, ক্ষতিকর কীটনাশক ও হাইব্রিড বীজ নিয়ন্ত্রণ, ষাটোর্ধ্ব কৃষকের জন্য পেনশন, বহুজাতিক কোম্পানির আগ্রাসন থেকে কৃষি মুক্ত করে দেশীয় বীজ ব্যাংক গড়ে তোলা—এসব বাস্তবসম্মত প্রস্তাব রয়েছে।

নারী ইশতেহারের একটি শক্তিশালী অংশ। সমান নাগরিক মর্যাদা ও আইনি অধিকার, উত্তরাধিকার ও সম্পত্তিতে ন্যায্য অধিকার, জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ১০০ আসন সরাসরি নির্বাচন, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ফাস্টট্র্যাক ট্রাইব্যুনাল, প্রতিটি থানায় নারী নিরাপত্তা ডেস্ক, ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ও ১৫ দিন পিতৃত্বকালীন ছুটি, সরকারি উদ্যোগে ডে–কেয়ার সেন্টার, সমান কাজে সমান মজুরি, গৃহস্থালি শ্রমের অর্থনৈতিক স্বীকৃতি, গণপরিবহনে নারীবান্ধব ব্যবস্থা—এসব প্রতিশ্রুতি নারী মুক্তির সংগ্রামকে বাস্তব রূপ দিতে বদ্ধপরিকর।

শিশুদের জন্য খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, নিরাপদ ইন্টারনেট, পথশিশুদের পুনর্বাসন, শিশু অধিকার বাস্তবায়নে ইউনেস্কোর নির্দেশনা অনুসরণ—প্রতিটি শিশুর জন্য আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। তরুণদের জন্য বেকারত্ব দূরীকরণ, চাকরিতে দুর্নীতি ও ঘুষ মুক্তি, রাজনৈতিক দলে তরুণ নেতৃত্ব ও মনোনয়নে অগ্রাধিকারের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত না করে কোনো প্রকল্প নয়, ভাতার সম্মানজনক বৃদ্ধি, উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাদের মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক—এসব প্রস্তাব মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় দেয়।

নগরায়ন, আবাসন ও পরিবহনে বিকেন্দ্রীভূত পরিকল্পিত নগরায়ন, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আবাসন, বস্তিবাসীদের জন্য কিস্তিতে ফ্ল্যাট, নদী ও জলাধার দখলমুক্ত করে নৌপরিবহন পুনরুজ্জীবিত, রেল উন্নয়নে বিশেষ কমিশন, গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, খেলার মাঠ উদ্ধার—এসব প্রস্তাব নগরজীবনকে বাসযোগ্য করতে।

প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষায় ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর, নদীর ন্যায্য পানি বণ্টন, ইটভাটা বন্ধ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, কৃষিতে প্রাকৃতিক পদ্ধতির প্রসার—এসব প্রস্তাব পরিবেশকেন্দ্রিক রাজনীতির নতুন দিশা দেখায়।

শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ নয় বরং সহায়ক ভূমিকা, সকল জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অধিকার ও নিরাপদ পরিসর, অনুবাদ কর্মসূচি জোরদার, লেখক ও শিল্পীর রয়্যালটি ও ডিজিটাল স্বত্ব সুরক্ষা—এসব প্রস্তাব সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক ও সার্বজনীন অধিকার হিসেবে ঘোষণা করে ইশতেহার বলছে, স্বাধীনতার মানে দায়িত্বহীনতা নয়, তবে রাষ্ট্র বা ধর্মের নামে সেন্সরশিপ গ্রহণযোগ্য নয়। সংবাদমাধ্যম হবে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় হবে সমালোচনামূলক চিন্তার নিরাপদ ক্ষেত্র, জ্ঞান উৎপাদন হবে স্বাধীন ও বহুমাত্রিক—সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ বা সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্য এই স্বাধীনতা ব্যবহার করা যাবে না।

এই ইশতেহার ঘোষণা করে গণসংহতি আন্দোলন বলছে, এটি কোনো নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার হাতিয়ার নয়, যা ভোটের পর ভুলে যাওয়া যাবে। এটি একটি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথনকশা, জনগণের স্বপ্নের রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার। ফ্যাসিবাদের পতনের পর এখন সময় চূড়ান্ত সংগ্রামের—সংবিধান সংস্কার পরিষদের নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্র কাঠামো দাঁড় করানোর, পুরনো লুটেরা অর্থনীতির বদলে উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ার, আর সবশেষে এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যেখানে প্রতিটি নাগরিক মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।

সম্পূর্ণ ডকুমেন্ট অনলাইনে পড়ুন অথবা ডাউনলোড করুন