জোনায়েদ সাকি বাংলাদেশের একজন রাজনৈতিক সংগঠক, গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আন্দোলনের নেতা এবং গণসংহতি আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ছাত্র আন্দোলন, জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলন, পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রাম এবং জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় তিনি দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশী সময় ধরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
বর্তমানে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য হিসেবে সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছেন।
১৯৭৩ সালের ৯ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার চরলোহনীয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জোনায়েদ সাকি। শৈশব ও কৈশোরে দেশের বিভিন্ন জেলায় বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক বোধ গঠনে ভূমিকা রাখে। ১৯৮৮ সালে মতিঝিল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৯০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। একই বছর স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি রাজনৈতিক সংগ্রামে যুক্ত হন।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর তিনি ছাত্ররাজনীতিতে আরও গভীরভাবে যুক্ত হন। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর নেতৃত্বে ছাত্র বেতন ও ফি বৃদ্ধি বিরোধী আন্দোলন, যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও দখলদারিত্ব বিরোধী আন্দোলন, জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলন এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌথ অংশগ্রহণভিত্তিক আন্দোলনের যে ধারা গড়ে ওঠে, তার অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি।
ছাত্র আন্দোলনের গণ্ডি অতিক্রম করে তিনি বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন, পরিবেশ ও উদ্যান রক্ষা, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষার প্রশ্নেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ২০০০ সালে ছাত্র ফেডারেশনের ষষ্ঠ কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নেন।
ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা কর্মী, শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক এবং বিভিন্ন গণআন্দোলনের সহযোদ্ধাদের নিয়ে ২০০২ সালের ২৯ আগস্ট গণসংহতি আন্দোলন প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন জোনায়েদ সাকি। জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লক্ষ্যে সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালের বিশেষ সাংগঠনিক সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে গণসংহতি আন্দোলন গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক শক্তির বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়াসেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে চার বাম দল, পাঁচ বাম দল, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, গণতান্ত্রিক বাম জোট এবং পরবর্তীতে গণতন্ত্র মঞ্চ গঠনের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
জোনায়েদ সাকির রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলন। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির অন্যতম সংগঠক হিসেবে তিনি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিবেশ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আন্দোলনে দীর্ঘদিন সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
২০০৬ সালের ফুলবাড়ি আন্দোলনে তিনি নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে জাতীয় সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষার দাবিতে সংগঠিত ঢাকা-সুন্দরবন লংমার্চ, রামপালবিরোধী আন্দোলন, সুন্দরবন অভিমুখে জনযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি।
বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ জোনায়েদ সাকি। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে সক্রিয় অবস্থান গ্রহণ করেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকার ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুগপৎ আন্দোলন এবং গণতন্ত্র মঞ্চ গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি পরিচিত। আন্দোলন-সংগ্রামের পথে একাধিকবার হামলা, গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের মুখোমুখি হলেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সংস্কার-আলোচনার প্রক্রিয়ায়ও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রশ্নে বিভিন্ন রাজনৈতিক উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেন।
২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি নগর রাজনীতিতে আলোচিত হন। ২০১৮ সালে ঢাকা-১২ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জোনায়েদ সাকির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রশ্ন। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা এবং গণমানুষের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি বৈষম্যহীন, অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পক্ষে কাজ করে আসছেন।