দেওয়ান আবদুর রশীদ নীলু বাংলাদেশের শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের একজন প্রবীণ সংগঠক এবং গণসংহতি আন্দোলনের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়কারী। ষাটের দশকের গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলা, কৃষক আন্দোলনের বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির বিনির্মাণ; এই দীর্ঘ পথচলার মধ্য দিয়ে তিনি দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত হয়েছেন।
শ্রমিক-কৃষকের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সংগ্রামে তিনি পাঁচ দশকেরও বেশী সময় ধরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
দেওয়ান আবদুর রশীদ নীলুর জন্ম ১৯৫৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর। কৈশোরেই তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় বরিশালে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। সেই সময়ের গণআন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক চেতনা ও সংগ্রামী মনোভাবকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি তরুণ যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে বরিশাল অঞ্চলের ঐতিহাসিক পেয়ারা বাগান এলাকায় তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পরও তিনি মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ধারণ করে এগিয়ে যান। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও তিনি কখনো মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণ করেননি।
স্বাধীনতার পর তিনি শ্রমিক শ্রেণির অধিকার ও মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
শ্রমিক সংগঠনের কাজে যুক্ত থাকার কারণে ১৯৭৫ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাবরণ করেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি বরিশাল কারাগারে বন্দী ছিলেন। কারাবাসের অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে আরও দৃঢ় করে এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তাঁর অঙ্গীকারকে গভীরতর করে।
১৯৮৯ সালে তিনি বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কৃষকদের অধিকার, ভূমি প্রশ্ন এবং গ্রামীণ জনগণের জীবন-জীবিকার দাবিকে কেন্দ্র করে তিনি দেশব্যাপী সংগঠন গড়ে তোলার কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
পারিবারিক বিশেষ পরিস্থিতিতে কিছু সময় দেশের বাইরে অবস্থান করার পর ২০০২ সালে দেশে ফিরে আসেন। ২০০৪ সালে পুনরায় বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সহ-সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং কৃষক আন্দোলনের বিকাশে নেতৃত্ব প্রদান করেন।
গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি ২০০৯ সালে গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টিতে যোগ দেন। সে সময় গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলনের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্যের আলোচনা চলছিল।
এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলন একীভূত হয়ে গণসংহতি আন্দোলন নামে নতুন রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলে। ঐক্য প্রক্রিয়ায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৫ সালে গণসংহতি আন্দোলন রাজনৈতিক দল হিসেবে নতুন সাংগঠনিক কাঠামোয় কাজ শুরু করলে এবং ২০১৬ সালের সাংগঠনিক সম্মেলনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠিত হলে তিনি রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
বর্তমানে তিনি গণসংহতি আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দেওয়ান আবদুর রশীদ নীলুর রাজনৈতিক জীবনের মূল ভিত্তি শ্রমিক-কৃষকের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্ন। শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক সংগঠন, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খা এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি বিনির্মাণের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক পথচলাকে সমৃদ্ধ করেছে।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শ্রমজীবী ও গ্রামীণ জনগণের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে সক্রিয় থেকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারাকে শক্তিশালী করার কাজে ভূমিকা রেখে চলেছেন।