লেখকের কথা
‘বদরুদ্দীন উমরের জীবন ও কাজ ’ সম্মাননা গ্রন্থে আমার লেখা..
…ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় ১৯৯৪ সালে। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। একজন মাঠের কর্মী হিসেবেই বদরুদ্দীন উমরের কাজ ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরিচয় ও সম্পর্ক। কীভাবে সেই সম্পর্ক ব্যক্তি হিসেবে আমাকে এবং আমাদের প্রজন্মর বেড়ে ওঠায় গাঢ় দাগ কেটেছে, যা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি তাই নিয়ে কিছু কথা এখানে বলার চেষ্টা করব। সেই আলাপের শুরুতে অতীতের দারস্থ না হয়ে পথ নেই। কারণ ‘উমর ভাই’ এবং ‘আমরা’’ পরস্পরের সম্পর্ক অতীতেই জমাট বেঁধেছিল এবং অতীতেই ফাটল ধরেছিল। নব্বই থেকে দুই হাজার সাল। এক দশকের বন্ধন, একসাথে চলার ইতিহাস।
…জন্মদিনে সম্মাননা গ্রন্থ উদ্দেশ্যে … এ লেখা নব্বই দশকে সংগঠনে কাজ করারই অভিজ্ঞতা। তবে সামগ্রিকভাবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, কাজের পদ্ধতি, কোন কোন সমালোচনার বিষয় ও ধরনের সাথে অনেকের মতো আমারও যে মতপার্থক্য সেসব নিয়ে জরুরি লেখা প্রয়োজনীয় কর্তব্য মনে করি। যা নিয়ে অন্যত্র নিশ্চয়ই লেখার সুযোগ হবে। একইসাথে ভরসা রাখি ভবিষ্যতে তাঁকে নিয়ে আরো অনেক পর্যালোচনা ও গভীর গবেষণা করবে বর্তমান এবং আগামীর তরুণ প্রজন্ম। ….’’
(নিচে পুরো লেখা দেয়া হলো। অনেক ধন্যবাদ আনু ভাই, আজফার ভাই এবং মুফাদ ভাইকে লেখার মতো কঠিন কাজে আমাকে উৎসাহ দেবার জন্য।)
কোনোরকম প্রাপ্তির চিন্তা বা হিসাব না করেই যে মানুষটি ষাটের দশক থেকে বাংলাদেশের কয়েক প্রজন্মকে রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় আলোড়িত করেছেন তাঁর নাম বদরুদ্দীন উমর। আমার রাজনীতিতে হাতেখড়ি নব্বই দশকে। সেই সুবাদে এই কয়েক প্রজন্মের আমিও অংশীদার। বলার অপেক্ষা রাখে না, রাজনৈতিক কাজকেই জীবনে আরাধ্য হিসাবে সসম্মানে ঠাঁই দিয়েছেন তিনি। বদরুদ্দীন উমরের জীবনবোধ, তাত্তি¡ক বোঝাপড়ার ভিত ও মানসিক শক্তি সহজেই পাশে সরিয়েছে চারপাশের হাতছানি-সুবিধাবাদিতা-মোহসহ নানা টানাপড়েন। ত্যাগের হাহাকারের বদলে জীবনের সন্তুষ্টি-প্রাপ্তি খুঁজেছেন তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মানুষের মাঝেই। এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের ৯০তম জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে লিখতে প্রস্তুতি ও আয়োজনে যে সমৃদ্ধি জরুরি তা নিয়ে বসিনি বলে অপরাধী লাগছে। তারপরও এই বিশেষদিন উপলক্ষে লেখার সুযোগ ও সাধের কাছে সাধ্য পরাস্ত হলো। বদরুদ্দীন উমর সবসময় আমাদের অঞ্চলে কোনো ব্যক্তির কাজ-লেখা নিয়ে যথাযথ সমালোচনামূলক লেখার অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। আগ্রহী ছিলেন, পরিচিতিমূলক লেখার চেয়ে সমালোচনামূলক লেখায়। তাই ইচ্ছে ছিল কখনো তাঁকে নিয়ে লেখার সুযোগ এলে প্রস্তুতি নিয়ে সমালোচনামূলক লেখাই লিখব। কিন্তু তা এ যাত্রায় আর হলো না। অপ্রস্তুতির অস্বস্তি এবং দায় কাঁধে নিয়েই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাসহ এই লেখা ভাই এর জন্মদিনে অতি সামান্য নিবেদন।
বদরুদ্দীন উমরকে আমিসহ আমাদের প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীরা ‘ভাই’ বলেই সম্বোধন করে আসছি। আমাদের প্রজন্মের একদল তরুণকর্মী যখন রাজনীতির ময়দানে পা রাখি তখন তিনি ছিলেন আমাদের ভরসাস্থল এবং অন্যতম রাজনৈতিক শিক্ষক। নব্বই দশকের নানান বাঁকে সমবয়সী একঝাঁক কিশোর-তরুণ আমরা তৎকালীন গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটভুক্ত (গ.বি. জোট) বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনে যুক্ত হই। ২০০০ সাল পর্যন্ত একই দলে একসাথে পথ চলা। খুব কাছ থেকে তাঁকে জানবার-চিনবার, তাঁর সান্নিধ্য-অপার ভালোবাসা ও বিশ্বাস পাবার সুযোগ হয় আমাদের। আমাদের প্রজন্মের একটা অংশের সঙ্গে তাঁর এবং দলের অন্য অংশের মত ও পথের পার্থক্যে একসাথে চলায় ছেদ ঘটে। স্বভাবতই তার প্রভাব পড়ে বোঝাপড়া ও সম্পর্কে। কাছ থেকে হঠাৎ-ই তিনি কিছুটা দূরের ও অচেনা জন হয়ে পড়েন। কিন্তু তাতে কোনোভাবেই তাঁর প্রতি আমাদের ঋণ বা শ্রদ্ধার কমতি ঘটার সুযোগ হয়নি। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে তাঁর অবদানকে স্বীকার করে এবং জানান দেওয়া অব্যাহত রেখেই আমাদের আলাদা পথ চলা।
নব্বই দশক, একটা আন্দোলনমুখর দশক। এই দশকের গর্ভেই রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমাদের জন্ম এবং বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে পরিচয়। ওই দশকের শুরু ৯ বছরের সামরিক শাসনের পতনের আন্দোলনে। এরপর বেশ কিছু ঘটনা সেই সময়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিল রাজনীতি প্রশ্নে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল : যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণআদালত গঠনের আন্দোলন (১৯৯১-৯২): পার্বত্য চট্টগ্রাম মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটি (১৯৯২) ব্লাসফেমি আইনবিরোধী আন্দোলন (১৯৯৪), দিনাজপুরে ইয়াসমিন ধর্ষণ-হত্যা ও গণপ্রতিরোধ (১৯৯৫), শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেতন-ফি বৃদ্ধি বিরোধী আন্দোলন (১৯৯৫-৯৬), কল্পনা চাকমার অপহরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন (১৯৯৬), ওসমানী উদ্যানের ১১ হাজার গাছ রক্ষার আন্দোলন (১৯৯৭)। পুরো দশকজুড়ে ছিল বিভিন্ন পোশাক কারখানায় আগুন ও শ্রমিক মৃত্যুর (সারাকা, লুসাকা ও অন্যান্য) প্রতিবাদ, হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদ; মাগুরছড়া বিস্ফোরণের প্রতিবাদ (১৯৯৭), লে. কর্নেল (অব.) কাজী নুর-উজ্জামানের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় কমিটি গঠন (১৯৯৭), তেল-গ্যাস রক্ষা ও সাম্রাজ্যাবাদবিরোধী আন্দোলন (১৯৯৭), শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন, (১৯৯৮, ২০০০ ঢা.বি ও জা.বি), সারের দাম বৃদ্ধি ও কৃষকের হত্যার প্রতিবাদ, শিল্প-কলকারখানা ধ্বংসের বিরূদ্ধে আন্দোলন, আগারগাঁও এবং অন্যান্য বস্তি উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি। এইসব ঘটনায় স্বতঃফূর্ত এবং সংগঠিত দু’ধরনের প্রতিক্রয়া-প্রতিবাদ চলেছে দশকজুড়ে। তৎকালীন গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের বাইরেও গণতন্ত্রকামী বহু ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মী-সংগঠক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক, শ্রমিক-কৃষক, ছাত্রের আনাগোনা ছিল ৬৮/২ পুরানা পল্টনের অফিস ঘিরে। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ১৯৯৪ সালের লেখক শিবিরের উদ্যোগে ব্লাসফেমি আইনবিরোধী প্রগতিশীল লেখকদের প্রতিবাদ; ওসমানী উদ্যানের গাছ রক্ষা আন্দোলন, যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ মঞ্চ ও অন্যান্য আন্দোলন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) অফিসের নিচে ছিল গ.বি. জোট অফিস। পল্টন মোড়ে ফুটপাত ঘেঁষে কয়েকটা দোকান পেরিয়ে ডান দিকে সরু একটা গলিতে ৬৮/২ পুরানা পল্টন অফিসের ঠিকানা। ওই পথে ঢুকতেই এক পাশের দেয়াল ঘেঁষা ছিল গণসঙ্গীত শিল্পী কামরুদ্দীন আবসারের ‘দীপ্র প্রকাশন’র বইয়ের দোকান। হেমাঙ্গ বিশ্বোসের ”নাম তার ছিলো জন হেনরীসহ’’ তাঁর গলায় গাওয়া এমনি নানা গান যেন আবসার ভাইয়ের’ নাম মনে করতেই কানে প্রতিধ্বনিত হয়। তখন তিনি দোকানে নিয়মিত থাকতেন, আসা-যাওয়ার পথে কথা হতো তাঁর সাথে। পাশেই আজাদ ভাইয়ের চায়ের দোকান পেরিয়ে কয়েক কদম বাদেই আকাশ দেখা যায় এমন খোলামেলা ছোট্ট একচিলতে জায়গা, চারপাশে আরো দু’চারটা অন্যান্য অফিস ঘর। নিঃশ্বাস নেবার ওইটুকু খোলা উঠানের মতো জায়গায় দু’জন-তিনজন-চারজন এমনি করে আড্ডা-আলাপ-তর্ক হতো আমাদের। বাসসের সিঁড়ির পাশে একটু কম আলোর ছোট পথ পেরিয়ে জাসদের আমিন ভাই ও ফারুক ভাইয়ের (গোলাম ফারুক ও আমিনুল হক) ব্যবসায়িক অফিস। তাঁদের সাথেও কখনো কখনো ঘন্টার পর ঘন্টা রাজনৈতিক আড্ডা চলতো। আমিন ভাই ও ফারুক ভাইয়ের ঘরের পাশে দুটো ছোট আর একটা লম্বা ঘর, এই নিয়ে ছিল গ.বি. জোট অফিস। তখন ছোট দুই ঘরের একটায় সাবলেট আকারে ছিলেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আজিজ মেহের ও পরে আইয়ুব রেজা চৌধুরী। পাশের লম্বা ঘরটাতেই সব কর্মী সংগঠকের আনাগোনা ছিল সবচেয়ে বেশি। এই ছিল ‘আমাদের’ অফিস সীমানা। অফিসে সকাল কিংবা রাতে প্রায়ই দেখা হতো রবীন আহসান (প্রকাশক) ও আলীফ দেওয়ানের (পুস্তক বাঁধাই শ্রমিক ইউনিয়নের সংগঠক) সাথে। এই দুইজন আমার দেখা মতে ওই অফিসে বহুদিন বসত গড়েছিলেন। বরিশালের সংগঠক ফরহাদ হোসেন ও পাবনার শামীম আহমেদও থাকতেন মাঝে মাঝে। একবার বিনা নোটিশে এই অফিস উচ্ছেদ হয়। আসাবাবসহ অনেক কাগজপত্র বাইরে রাস্তায় ফেলে দেয় দখল চেষ্টাকারীরা। খবর পেয়ে যে যার মতো দৌড়ে ছুটে আসে। নিজ ঘর উচ্ছেদ হলে যেমন হয়, তেমনি ব্যাকুল হয়ে অফিস আগলে রাখতে সমস্ত কিছু উদ্ধারে নামি আমরা। এমনি কত স্মৃতি জমা ঐ ঠিকানায়। ৬৮/২ পুরানা পল্টনের ঠিক উল্টো পাশে সিপিবির অফিস। মোড়ের কোণে লাগোয়া মুক্তাঙ্গন। তখন মুক্তাঙ্গনে রাজনৈতিক দলের নিয়মিত কর্মসূচি চলতো। মাইকের আওয়াজ পাওয়া যেত ওই অফিস থেকেই। একই এলাকায় কাছাকাছি দূরত্বে বাসদ, জাসদ, ওয়ার্কাস পার্টি এমনকি সরকারি ও বিরোধীদলের রাজনৈতিক দলেরও অফিস। এমনি নানা স্মৃতি ঘিরে ও এমনি রাজনৈতিক পরিবেশে বদরুদ্দীন উমরের নেতৃত্বাধীন দলে আমাদের আড্ডা-আলাপ-আলোচনা-বন্ধুত্ব গড়া-ভাঙা এবং রাজনৈতিক কৈশোর পার হয় সেই স্মৃতিঘেরা অফিসে।
আমাদের রাজনৈতিক কৈশোরের স্মৃতিঘেরা ওই অফিস একইসাথে নব্বই দশকে জন-মানুষের নানা ছোট বড় আন্দোলনের কেন্দ্রও হয়ে উঠছিল। ওই সময়ে আন্দোলন পর্যালোচনা-বিশ্লেষণ, তাতে অংশগ্রহণ এবং আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও বদরুদ্দীন উমর, আনু মুহাম্মদ ও ফয়জুল হাকিমের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি গ.বি. জোটের ভেতরের এবং বাইরের বহুজনকে একই মঞ্চে একত্রিত করতে বিশেষভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন আনু মুহাম্মদ। তেল-গ্যাস রক্ষার আন্দোলন এবং যৌন নিপীড়ন মঞ্চে আনু মুহাম্মদের নেতৃত্বমূলক ভূমিকা তারই উদাহরণ। যদিও পরবর্তীতে বদরুদ্দীন উমর এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের চিন্তা ও কাজের পদ্ধতি ও ধরনের সঙ্গে অনেকেরই মতপার্থক্য দেখা যায়।
ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় ১৯৯৪ সালে। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। একজন মাঠের কর্মী হিসেবেই বদরুদ্দীন উমরের কাজ ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরিচয় ও সম্পর্ক। কীভাবে সেই সম্পর্ক ব্যক্তি হিসেবে আমাকে এবং আমাদের প্রজন্মর বেড়ে ওঠায় গাঢ় দাগ কেটেছে, যা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি তাই নিয়ে কিছু কথা এখানে বলার চেষ্টা করব। সেই আলাপের শুরুতে অতীতের দারস্থ না হয়ে পথ নেই। কারণ ‘উমর ভাই’ এবং ‘আমরা’ পরস্পরের সম্পর্ক অতীতেই জমাট বেঁধেছিল এবং অতীতেই ফাটল ধরেছিল। নব্বই থেকে দুই হাজার সাল। এক দশকের বন্ধন, একসাথে চলার ইতিহাস। রাজনীতিতে হাঁটিহাঁটি পা-পা রাখা, জীবন-জগৎ সম্পর্কে অপার কৌতূহল এবং সবাইকে নিয়ে জীবনটা বদলাতে জীবনপণ রাখার অদম্য ইচ্ছার টগবগে শুরুর সেই সময়ে বদরুদ্দীন উমর ছিলেন আমাদের দিশারি। আলাদা রাজনৈতিক অবস্থানে থাকলেও তিনি তাঁর লেখা ও কাজের মধ্য দিয়ে বর্তমানেও আমাদের মাঝে বিরাজমান।
বদরুদ্দীন উমরের দেশীয় ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ; করণীয় বিষয়ে চিন্তায় আমরা বিশেষ উদ্বুদ্ধ ছিলাম। যদিও তখন গ.বি. জোটের অবয়ব খুব বড় ছিল না, কিন্তু প্রাণে ভরপুর ছিল। একদিকে উদীয়মান তরুণ নেতৃত্ব অন্যদিকে আশাজাগানিয়া জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব। মাঠ পর্যায়ে সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা চলছিল। কর্মীদের চিন্তা ঝালাই-গোছানো ও পাকাপোক্ত করায় গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগ ছিল বদরুদ্দীন উমরের। তাঁর লেখা মুক্তি কোন পথে, বাঙলাদেশে আর্থসামাজিক পরিবর্তনের ধারা, সাম্প্রদায়িকতা, সংস্কৃতির সংকট, সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা, ভূমি সংস্কার, পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ, বাঙলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা, বাঙলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ইত্যাদি গ্রন্থ ছাত্রাবস্থায়ই ছিল আমাদের নিয়মিত পাঠ্য। অনেকটা সর্বক্ষণ বহু যত্নে ভালোবাসায় আগলে রাখা আকর গ্রন্থের মতো। যেগুলো আমরা বার বার পড়তাম, নতুনদের পড়তে দিতাম এবং তা নিয়ে পাঠচক্র ও আলোচনা হতো।
ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে তাঁর লেখা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনবদ্য রচনা। শাসকশ্রেণির মূলধারার বয়ানে যেখানে প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে পাওয়া ভার, সেখানে বদরুদ্দীন উমর একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে নিজ অভিজ্ঞতা ও গবেষণায় ভাষা আন্দোলনের জন-মানুষের বয়ান হাজির করেন। মূলধারার ইতিহাস চর্চার বাইরে জনগণের ইতিহাস জানার জায়গায় বদরুদ্দীন উমরের যে অবদান তা তাঁর পূর্বে এ অঞ্চলে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি করতে পারেননি। অথচ ইতিহাসের উল্টো পথে চলা কিংবা বেদখলের হাত থেকে রক্ষার দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বেরই।
এই অঞ্চলের রাজনৈতিক সাহিত্যে জটিল বিশ্লেষণ এবং তত্ত্ব নির্মাণের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ লেখকের (রাজনৈতিক নেতৃত্ব) ভাষায়ও এক ধরনের জটিল বিন্যাস টের পাওয়া যায়। বদরুদ্দীন উমরের লেখায়ও তার কিছু ছাপ আছে। তবে তাঁর লেখার বিশেষত্ব ছিল তীক্ষ্ম শব্দ-বাক্যের ব্যবহার, সঙ্গে বিদ্রুপ ও আবেগীয় প্রকাশের শক্তি এবং ধারালো সমালোচনা। এই বিশেষত্ব নিয়ে তিনি দেশীয় ও বিশ্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ, শাসকশ্রেণি ও তাঁদের মদদপুষ্টদের খোলামেলা নিঃসঙ্কোচে সমালোচনা করে গেছেন।
বদরুদ্দীন উমরের উদ্যোগে প্রকাশিত জনযুগ এবং সংস্কৃতি’র সঙ্গে আমাদের খুব কাছ থেকে একটা যোগাযোগ ছিল। লেখা নিয়ে পরিকল্পনা, লেখকদের লেখা সংগ্রহ, এক জায়গায় জমা হওয়া, ছাপাখানায় যাওয়া এমনকি বিক্রি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার তৎকালে প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম আমরা। এর প্রভাবও ছিল আমাদের ওপর বিস্তর। জনযুগ এবং সংস্কৃতি দুটি প্রকাশনায় বদরুদ্দীন উমর ও আনু মুহাম্মদ দু’জনার চিন্তা ও শ্রমের অংশগ্রহণ পুরনো প্রকাশনাগুলো হাতে নিলে এখনো অনুভব করতে পারি। আমাদের সময়ে এই দুজনার সঙ্গে এ-কাজে বিশেষ ও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন ফিরোজ আহসান, যাকে ছাড়া সংস্কৃতি ভাবা যেত না। এছাড়া মাহবুবুর রহমান, হাসিবুর রহমান, জোনায়েদ সাকি, উজ্জ্বল বালো, এরাও বিভিন্ন সময়ে নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকে ভূমিকা রেখেছিলেন এই দুই প্রকাশনায়। তখন জনযুগ নিউজপ্রিন্টে সাদাকালোয় প্রকাশিত হতো। সাদাকালো বড় বড় হরফে শিরোনাম, ভেতরের লেখা ও ছবিসহ সব সাদাকালোয় ট্যাবলয়েড আকারের পাক্ষিক। সংস্কৃতির কভারটা ছিল নানান রঙের আর ভেতরটা যথারীতি সাদাকালো। সংস্কৃতিতে লেখায় কোনো ছবি ছিল বলে মনে করতে পারি না। আমরা অপেক্ষায় থাকতাম কখন জনযুগ ও সংস্কৃতি বের হবে তার জন্য। জনযুগে লেখার সুযোগই ছিল আমার মতো কোনো কোনো তরুণ কর্মীর লেখাচর্চার শুরু। জনযুগ ও সংস্কৃতির নিয়মিত প্রকাশ ও নানা বিষয়ে বিশ্লেষণ আমাদের পিপাসাকে প্রশমিত করতো। এবং এই ধরনের প্রকাশনার প্রয়োজনীয়তা, নিয়মিত থাকা, মান বজায় রাখা যে রাজনৈতিক দলে অপরিহার্য তা গভীরভাবে উপলবিদ্ধ করতে শিখি তখন। জনগণের মনে শাসকশ্রেণির চিন্তা ও প্রচারণার মহাসমুদ্রে এই সামান্য প্রকাশনাও পাল্টা মতাদর্শিক লড়াই গড়ে তোলায় যে কত বড় ঘটনা তা বুঝতে বাকি থাকে না। এভাবেই আমাদের রাজনৈতিক চিন্তা, নৈতিক অবস্থানের প্রাথমিক ভিত গড়ে ওঠে গ.বি. জোটের চিন্তা ও চর্চায়।
আমাদের বেড়ে ওঠায় বদরুদ্দীন উমর ছিলেন অন্যতম প্রাণশক্তি। তার নামের সঙ্গে আরেকজনের নাম আমাদের হৃদয়ে প্রাণ সঞ্চার করতো, তিনি হলেন আনু মুহাম্মদ। ২০০০ সালে বদরুদ্দীন উমর তাঁর নেতৃত্বাধীন গ.বি. জোটের চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির সঙ্গে আমাদের ছাত্রকর্মীদের মতপার্থক্যের সময়কালে আনু মুহাম্মদের সঙ্গেও তাঁর কাজের ইতি ঘটে। কিন্তু ওই দশকে এ দু’জনার কথা একসাথে বলতেই হতো আমাদের। দলের প্রাণশক্তি ও ভরসা হিসেবে দুজনই নিবিড়ভাবে আমাদের মনে আসন গেড়ে পাশাপাশি ছিলেন। বদরুদ্দীন উমরের মুক্তি কোন পথে আর আনু মুহাম্মদের আমাদের সমাজ, সমাজ পরিবর্তনের নিয়ম ও সমাজতন্ত্র আমাদের জন্য অনেকটা রাজনীতির প্রথম পাঠ ছিল। বদরুদ্দীন উমরের নাম বললে সহজাতভাবে পরের নামটা আনু মুহাম্মদের হবে এটাই যেন ছিল আমাদের সবার জানা এবং সবার জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক উচ্চারণ।
ওই একই সময়ে বটবৃক্ষের ছায়ার মতো পাশে ছিলেন কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও। লেখক শিবিরের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও আনু মুহাম্মদের সম্পাদনায় তখন প্রকাশিত হতো সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা তৃণমূল। যা সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে আগ্রহের জায়গা তৈরি করে। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক শওকত আলী, আজফার হোসেন, মনিরুল ইসলাম কচি, চৌধুরী মুফাদ আহমেদ এঁরাও তখন সক্রিয় ছিলেন লেখক শিবিরে। বদরুদ্দীন উমরের সাথে সাথে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আনু মুহাম্মদ ও আজফার হোসেন এই তিনের বিশেষ ভূমিকা ছিলো লেখক শিবিরকে নতুনভাবে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে। ১৯৯৪ এ বিএনপি সরকারের ব্লাসফ্যামী আইন বিরোধী লেখকদের প্রতিবাদ সংগঠিত করায় তাঁদের ছিলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাঁদের সঙ্গেও পরিচয়ের নৈকট্য ছিল আমার। তখন লেখক শিবিরে সবার মুখে আসহাব উদ্দিন আহমেদ, হাসান আজিজুল হক, শান্তনু কায়সার, আবরার চৌধুরীর নাম আসতো।
বদরুদ্দীন উমরের নেতৃত্বাধীন গ.বি. জোটে তৎকালে সক্রিয় আরো ক’জনার কাজের সঙ্গে পরিচয় বা সরাসরি সম্পর্ক ছিল, তাঁদের নাম এখানে উল্লেখ না করলেই না। স্মৃতিতে এখনো যারা আছেন তাঁরা হলেনÑকমরেড সইফ-উদ্-দাহার, শাহ্ আতিউল ইসলাম, লুৎফুর রহমান বকুল, আব্দুল হামিদ খান আফগান, সজিব রায়, আতিয়ার রহমান, নুরুল ইসলাম হেলালী,করিম আব্দুল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, মুঈনদ্দীন আহমেদ, আব্দুল আলী, বাচ্চু ভূঁইয়া, দেলোয়ার হোসেন প্রমুখ। যারা শ্রমিক-কৃষক গণসংগঠনসহ জোটের নানা দায়িত্বে ছিলেন। তৎকালের ছাত্র ফেডারেশনের জনপ্রিয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আহাদ আহমেদ ও উদয় পাল। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে আরো ছিলেন হাবিবুর রহমান, রকিব পারভেজ, মতিউর রহমান, বিপ্লব রহমান, মিলু শামস প্রমুখ। ছাত্র রাজনীতিতে পা দিয়েই খুব কাছ থেকে আমরা পেয়েছিলাম আহাদ আহমেদ ও উদয় পালকে। এ করোনাকালে আহাদ আহমেদের বিদায় নেওয়া আমাদের জন্য আকস্মাৎ এবং অত্যন্ত মর্মবেদনার।
আহাদ আহমেদ ও উদয়পালের পর পরই ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় সংগঠক হিসাবে ছিলেন মারুফ হোসেন, ফারুক আহমেদ, সঞ্চয় চাকমা, জোনায়েদ সাকি, মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, মবিনুর রহমান মিঠু, উজ্জ্বল বালো, ফিরোজ আহমেদ, ফারুক ওয়াসিফ, হাসান মারুফ রুমি, আমির আব্বাস তাপু, বরকতুল্লাহ মারুফ, মঞ্জুরুল হক খান পরাগ, আবেদা গুলরুখ, ইখতিয়ার উদ্দীন বিপা, মনির উদ্দীন পাপ্পু, আবু বকর রিপন, মুনীর চৌধুরী সোহেল, ইফতেখার মাহমুদ প্রমুখ যাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এছাড়াও ছিল বিভিন্ন শাখার অসংখ্য নেতাকর্মী। জোনায়েদ সাকি ছিলেন গ.বি. জোট ও ছাত্র ফেডারেশনের একজন একনিষ্ঠ কর্মী। ওই সময়ে তিনি ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও তরুণদের অনুপ্রেরণা। সেই সময় জোনায়েদ সাকি, ফিরোজ আহমেদ, ফারুক ওয়াসিফসহ আমরা বেশ কয়েকজন যেমন সাধ্যমতো সংগঠন গড়ার চেষ্টা করেছিলাম, তেমনি রাজনীতির তত্ত¡, কৌশল ও কর্মপদ্ধতি নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলতে পিছপা হইনি। তরুণরাই কেবল নয়, জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বরাও সংগঠনে প্রশ্ন তুলেছিলেন বহুবার। বদরুদ্দীন উমরের চারপাশ ঘিরে এদেরকেই পেয়েছিলাম অনুপ্রেরণার উৎস, নেতৃত্ব ও সংগঠনের বন্ধন হিসেবে। কেন্দ্রে তিনি এবং তাঁকে ঘিরেই যেন সবাই। তাঁর সঙ্গে মতপার্থক্য ও আলাদা রাজনৈতিক অবস্থানের প্রভাব পড়ে সেই কেন্দ্রে এবং বন্ধনেও।
বদরুদ্দীন উমরের ৯০তম জন্মদিনের লেখায় আরো দশজন; দশ আন্দোলন নিয়ে দশ কথা কেন বলছি কেউ ভাবতেই পারেন। আমি স্পষ্টভাবেই মনে করি বদরুদ্দীন উমরকে বুঝতে হলে যেই সময়ের মধ্যে আমি বা আমাদের প্রজন্ম তাঁকে পেয়েছি সেই সময় ও মানুষগুলোকে বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ। এইসব মানুষ, আন্দোলন, সময়, চিন্তা, চিন্তার পার্থক্য, ভিন্ন অবস্থান গ্রহণÑএসব মিলিয়েই বদরুদ্দীন উমর ও তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও পথ-পরিক্রমা পাঠ বাঞ্ছনীয়। না হলে বদরুদ্দীন উমরকে খণ্ডিতভাবে পাঠ করা হবে। কারণ বদরুদ্দীন উমর মানে কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা লেখক নন। আমার কাছে বদরুদ্দীন উমর মানে একটা রাজনৈতিক চিন্তা, একটা রাজনৈতিক অধ্যায়, একটা কালপর্ব। এই পর্বে বদরুদ্দীন উমর, আনু মুহাম্মদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ডা. সইফ-উদ্-দাহার, শাহ্ আতিউল ইসলাম, ফয়জুল হাকিম লালা এমনি জ্যেষ্ঠরা যেমন ছিলেন তেমনি ছিলেন হাসিবুর রহমান, জোনায়েদ সাকি, ফিরোজ আহমেদ, ফারুক ওয়াসিফসহ অনেক তরুণ সংগঠক যারা একসাথে আমাদের সময়ে-জীবনে জড়াজড়ি করে ছিলেন, যাকে অস্বীকারের জো নেই।
বদরুদ্দীন উমরের লেখা যেমন আমরা পাঠ করতাম, তেমনি তিনি বিশেষভাবে উৎসাহিত করতেন ইতিহাস পাঠের জন্য। সাম্যবাদী তত্ত¡, পার্টি প্রশ্নে নানা লেখার পাশাপাশি ঊনবিংশ শতাব্দীতে ঔপনিবেশিক প্রভাবে গড়ে ওঠে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ইতিহাসকে বিশেষভাবে পাঠ করার জন্য তিনি বলতেন। তাঁর উৎসাহে শিবনাথ শাস্ত্রীর বিখ্যাত গ্রন্থ রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গ সমাজ, বিনয় ঘোষের নানা গ্রন্থ পাঠ করেছিলাম। ওইসব পাঠের মধ্য দিয়ে ঊনিশ শতকের বাঙালি সমাজ ও মধ্যবিত্তকে কিছুটা হলেও বুঝতে শিখেছিলাম। ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য বদরুদ্দীন উমর আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন।
গ.বি. জোটের তৎকালীন পরিমন্ডলে বেড়ে উঠতে গিয়ে এই শিক্ষা পেয়েছিলাম রাজনীতিতে গণসংগঠনে কাজের অভিজ্ঞতা ছাড়া আগানো মুশকিল। জেনেছিলাম, নেতৃত্ব কেবল বুদ্ধিবৃত্তি নয়, গণভিত্তি ও সাংগঠনিক চর্চার ওপর ভর করে গড়ে ওঠে। সমাজ পরিবর্তনের কর্মী হিসাবে দাবি করার প্রাথমিক শর্ত সমাজের অধিকাংশ মেহনতির লড়াইয়ে-জীবনে মাঠে ময়দানে যুক্ত হওয়া। এই দৃষ্টিভঙ্গি মনে প্রাণে গ্রহণ করেই শ্রমিক-কৃষক এলাকায় কাজ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ছিল।
জাতি প্রশ্নেও আমাদের ভাবনা দানা বাঁধায় বদরুদ্দীন উমর ও গ.বি. জোটের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ব্যারিস্টার লুৎফর রহমান শাহজাহানকে আহŸায়ক করে ১৯৯২ সালে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটি। তখন ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) নতুন দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৯৬ সালে জুন মাসে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমা অপহৃত হন। তাঁর প্রতিবাদ গ.বি. জোট থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে করা হয়। কারণ জাতি প্রশ্ন নিয়ে গ.বি. জোট সোচ্চার ছিল বরাবর। হিল উইমেন্ড ফেডারেশনের বন্ধুদের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে ও অন্যান্য হলে তখন কল্পনা চাকমার অপহরণের প্রতিবাদে আমরা প্রচারণা চালাই। ওই সময় আমার সমবয়সী রোকেয়া হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে শ্যামলী শীল, সুলেখা রহমান ও মুন্নী মৃ অন্যতম। জনযুগ সংস্কৃতিতে ওই সময়ে জাতি প্রশ্নে বিশেষ লেখালেখি ছাপা হতো। ১৯৯৮ সালে বদরুদ্দীন উমরের সম্পাদনায় প্রকাশ পায় পার্বত্য চট্টগ্রাম: নিপীড়ন ও সংগ্রাম গ্রন্থ। বদরুদ্দীন উমর, আনু মুহাম্মদ, আখতারুজ্জাম ইলিয়াসের বেশ কিছু লেখা সেখানে স্থান পায়। সঙ্গে ফয়জুল হাকিম লালার সাক্ষাৎকার ও কবিতা চাকমার লেখা। এই সমস্ত তৎপরতা জাতি প্রশ্নে আমাদের বোঝাপড়ায় শান দিতে থাকে। নারী প্রশ্নেও দলের ভেতর ছিল বিশেষ মনোযোগ।
১৯৯৪ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সময়ে কল্পনা চাকমা অপহরণ, ইয়াসমিন ধর্ষণ এবং বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন, পোশাকখাতে লাখো নারীর উপস্থিতি এবং গ.বি. জোটের নারী প্রশ্নে আলাদা যতœ আমাদের আগ্রহে সাহস জুগিয়েছিল। মানুষ হিসেবে জীবনের স্বাদ পাওয়ার বাসনা রাজনীতিতে আরো সক্রিয় করেছিল আমাদের মতো নারী কর্মীকে। সেই সময়ে নারী প্রশ্নকে মধ্যবিত্ত আঙিনার বাইরে মেহনতি নারীর লড়াইয়ে যুক্ততার প্রশ্নে চিন্তার খোরাক জুগিয়েছিলেন বদরুদ্দীন উমর এবং আনু মুহাম্মদ। নারী প্রশ্নে তাঁদের ছিল নিয়মিত ও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে লেখা। জনযুগ ও সংস্কৃতি পত্রিকায় এ নিয়ে অন্যান্যদের নিয়মিত লেখা, অনুবাদ ও প্রতিবেদন ছাপা হতো।
তখনও গ.বি. জোটে নারী সংগঠন ছিল না। আমাদের সামনে জ্যেষ্ঠ্য নেতৃত্ব হিসাবে নারীদের জোরালো উপস্থিতির অভাব ছিল। অল্প কিছু জ্যেষ্ঠ সদস্য-সংগঠক বিভিন্ন গণসংগঠনে ছিলেন এবং পারিবারিক সূত্রে কারো কারো আসা-যাওয়া ছিল। সুরাইয়া হানম, আনোয়ারা বেগম, সোহেলী ফেরদৌস রুমি, নাদিরা অনু, রওশন হাকিম বেবী, শিল্পী বড়ুয়া, ফেরদৌসী বেগম, এহসানি মনি, রুচিরা ইসলাম, মিলু শামস, দোলা আহমেদ এমনি কয়েকজনকে মনে করতে পারি। তবে তরুণদের মধ্যে ছাত্র ফেডারেশনের বিভিন্ন শাখায় একঝাঁক নারী তখন সদস্য হয়েছিল। সংগঠনের বাইরে আমাদের সমবয়সী অনেক নারীর সঙ্গে আমাদের সখ্য ছিল যারা ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নবিরোধী লড়াইয়ে সক্রিয় ছিল।
দু’হাজার সাল পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অন্যত্র নারী নির্যাতনবিরোধী নানা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণের ক্ষোভ এবং প্রতিবাদ দানা বাঁধতে থাকে। তাই দেখে আমরাও ছাত্রাবস্থায় আলাদা নাারী সংগঠন গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতাম। প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতাম মধ্যবিত্ত ও এনজিওর গÐির বাইরে ব্যাপক মেহনতি নারীর মধ্যে আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত করার। সংস্কৃতির নারী প্রশ্নে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। বিশেষ সংখ্যাটি ছিল নারী প্রশ্ন এবং এর ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে। এটি প্রকাশের এক বছর আগেই আনু মুহাম্মদের লেখার সংকলন নারী-পুরুষ ও সমাজ প্রকাশিত হয়। সংগঠনের ভেতরে-বাইরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার মধ্যে নারী প্রশ্ন বোঝাপড়ায় ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে এই গ্রন্থ। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে বদরুদ্দীন উমরের সম্পাদনায় সংস্কৃতির ঐ বিশেষ সংখ্যা নারী প্রশ্ন প্রসঙ্গে নামে বই আকারে বের হয়। আনু মুহাম্মদ ও বদরুদ্দীন উমরের লেখা, জনযুগে মনিরুল ইসলাম কচির ধারাবাহিক লেখা, সংস্কৃতির বিশেষ সংখ্যাসহ নানাজনের লেখা আমাদের চিন্তাকে নারী বিষয়ে প্রসারিত, বিন্যস্ত ও শক্তিশালী হতে পুষ্টি জুগিয়েছিল। বাংলাদেশে সেই সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক রেহনুমা আহমেদ, আনু মুহাম্মদ, মানস চৌধুরী নতুন এক প্রজন্মকে নারী ও সমাজ নিয়ে ভাবতে এবং প্রশ্ন করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনসহ নানা আন্দোলনে তাঁদের ভূমিকা ছিল স্মরণ করার মতো। তখন তাঁদের সঙ্গে মতবিনিময়, নানা আলোচনা ও আন্দোলনে যৌথভাবে অংশ নিতাম আমরা। রবিবার সাপ্তাহিক সাধারণ পাঠচক্রের বাইরে রোকেয়া হলে নারী শিক্ষার্থীদের আলাদা পাঠচক্র-আলোচনা হতো তখন ছাত্র ফেডারেশেন ঢাবি শাখার উদ্যোগে।
নারী প্রশ্নে অন্য বাম রাজনৈতিক দলের তেমন তাত্তি¡ক বা ইতিহাস পর্যালোনা চোখে পড়েনি তখনও। সেই সময়ে সক্রিয় নারী সংগঠনের ছিল নানা দিবস পালন ও নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে লড়াই-তৎপরতা। তবে নারী আন্দোলনের সমস্যা চিহ্নিত করে সাংগঠনিক ও আদর্শিক প্রস্তুতির কাজে ঘাটতি ছিল। গ.বি. জোটের নারীদের নিজস্ব সাংগঠনিক প্রসার বা নেতৃত্ব হিসেবে উপস্থিতি তেমন ছিল না। কিন্তু তাত্তি¡কভাবে নারী সমস্যার কারণ, ঐতিহাসিক পর্যালোচনা এবং নারী মুক্তির লড়াই নতুন করে সংগঠিত করার প্রেরণা তৈরি হয়েছিল সেই সময়ে।
ব্যক্তি বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে এবার দু’কথা বলতে চাই। তাঁর সঙ্গে পরিচয় ২৭ বছর আগে। তখন তিনি ষাটের ঘরে আমি বিশের। পল্টনের অফিসে প্রায়ই তিনি হাসিমুখে আমাদের খোঁজ-খবর নিতেন, কথা বলতেন সুযোগ পেলে। কৃষক মেহনতি থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে কাজের নানা অভিজ্ঞতার গল্প করতেন। গল্প করতেন ইতিহাসে ফিরে গিয়ে। মিরপুরের রূপনগরে তার বাড়িতেও ব্যক্তিগত পরিসরে আসা-যাওয়া ছিল আমাদের। চেনা ছিল তাঁর পোশাক-আশাক ভঙ্গি ও শৃঙ্খলা। পুরো সাদা-সফেদ চুল, হাফ হাতা সাদা শার্ট আর ভারি কাঁচ ও পাওয়ারের চশমা পরা এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবনের শৃঙ্খলা এবং নিয়মানুবর্তিতা অনেকের মতো আমাকেও বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করতো। তিনি প্রায়ই আমাদের একটা কথা বলতেন, “অভ্যাস মানুষের বন্ধু, অভ্যাসই মানুষের শত্রæ”। তার রাজনৈতিক জীবনে দায়িত্বশীলতা, নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা যে অভ্যাস এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ সেটা বুঝতে কষ্ট হতো না।
সেই সময় তরুণ কর্মীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে তিনি নিজের বই উপহার দিতেন এবং অন্যদের লেখা পড়তেও উৎসাহ দিতেন। তাঁর স্বাক্ষরে উপহার হিসেবে বেশকিছু বই জমা হয়েছিল আমার সেলফে। সেগুলোতে শুভেচ্ছা ও দু-এক লাইন আশা-জাগানিয়া বক্তব্য থাকতো। মাঝে মাঝে পাতা উল্টে দেখতাম এবং কাজে উদ্যম পেতাম। তিনিও আমাদের ওপর বিশেষ ভরসা করতেন। আমাদের মতো অল্পবয়সী কর্মীদের প্রতি তাঁর যতœ-টান-ভালোবাসা টের পাওয়া যেত। তাঁর চোখেমুখে সেই আভাস লেগে থাকতো।
তিনি কেবল নেতা, অভিভাবক নন, কখনো কখনো বন্ধুর মতোও পাশে ছিলেন। রাজনীতিসহ ব্যক্তিগত বিষয়েও অনেকের মতো আমার সঙ্গেও কথা হতো। ১৯৯৬-৯৭ এর দিকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের এক জটিলতায় কিছুটা বিপর্যস্থ হই। সংগঠনে তখন অনেকে ভুল বুঝলেও খুব কমজন-ই পাশে ছিল। উমর ভাই নিজ দায়িত্বে পাশে ছিলেন বিপদের বন্ধুর মতো। সেই সময়ে চিঠি লেখার চল ছিল। আমার চিঠি লেখার অভ্যাস ছিল, উমর ভাইয়েরও। তখন ফেসবুক-মোবাইলের জমানা না। হঠাৎ মন চাইলো মেসেজে বা ফোনে তাৎক্ষণিকভাব বিনিময়ের বদলে চিঠি ছিল সংগঠিত ভাব আদান-প্রদানের মাধ্যম। কর্মী-সংগঠক-নেতৃত্বের যোগাযোগ ও চিন্তার বিনিময় হতো চিঠিতে। সেসব চিঠি এখনো ফাইলে সাজানো আছে আমার কাছে। সৌভাগ্য যে এর মাঝে হাতেগোনা কয়েকটা ছিল উমর ভাইয়ের নিজের হাতের লেখা আমাকে। সেখানে তার আস্থা, ভরসার কথা যেমন ছিল, তেমনি ছিল রাজনীতি নিয়ে তাঁর আশা-নিরাশা ও স্বপ্নের কথাও। সেসব চিঠি বিরাট শক্তি ও উদ্দীপনার অংশ ছিল আমার জন্য। বহু বছর পর ১৯৯৬ সালে তাঁর আমাকে লেখা একটি চিঠিতে চোখ বুলিয়ে স্মৃতিতে এবং ইতিহাসে ফিরে গিয়ে তাঁকে নিয়ে এই লেখার প্রস্তুতি শুরু করি।
উমর ভাইয়ের কাছে প্রায়ই শুনতাম তাঁর মা মাহমুদা আখতার মেহের বানুর মৃত্যুদিন এবং আমার জন্মদিন একই তারিখে। ১৯৯৪ সালের ৬ মার্চ তাঁর মা মৃত্যুবরণ করেন। বদরুদ্দীন উমরের কাজ নিয়ে আলোচনা বা লেখালেখিতে সবাই তাঁর বাবার কথা আনেন। তিনি পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এমনকি উইকিপিডিয়ায় ‘প্যারেন্টের’ ঘরে কেবল তাঁর বাবা আবুল হাশিমেরই নাম লেখা। এটা আমাদের সমাজ সংস্কৃতিতে চোখ সয়ে যাওয়া ঘটনা। কিন্তু তাতে অনেকের অবদান বিশেষভাবে নারীর অবদান ইতিহাসে অনুল্লেখিত রয়ে যায়। যাক মেহের বানুর কথায় আসি। উমর ভাইয়ের মার বাড়ি ছিল কলকাতার হুগলীতে, বাবার বর্ধমানে। সে সময় নারীশিক্ষা তাঁদের পরিবারে খুব সমাদৃত ছিল না। তারপরও তাঁর বাবা (আবুল হাশিম) তাঁর মাকে স্কুলে পাঠান। যদিও পারিবারিক আর সব বাধা ডিঙিয়ে পড়াশোনা শেষ করা হয়নি তাঁর। কিন্তু আবুল হাশিমের উৎসাহে মেহেরবানু পরিবারের মধ্যে প্রথম পর্দাপ্রথা ভেঙে ঘরের আঙিনার বাইরে পা রাখেন। বদরুদ্দীন উমরের ৯০তম জন্মদিনে তাঁর মা মেহের বানুর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা জানাই। তাঁকে স্মরণ করি যিনি পৃথিবীর আলোবাতাসে বদরুদ্দীন উমরকে প্রাণ দিয়েছেন এবং আমাদের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ করে দিয়েছেন। আশা রাখি মেহের বানুর মতো চরিত্রদের সাথে রাজনৈতিক আঙিনায় ভবিষ্যতে আমাদের আরো পরিচয় ঘটবে।
কৃতজ্ঞতা জানাই তাঁর পরিবারের আরেকজন সদস্য সুরাইয়া হানমকে, যিনি দাম্পত্যসঙ্গী হয়ে দীর্ঘ সময় তাঁর পাশে আছেন। একটা সময় রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মতো মধ্যবিত্তের কাক্সিক্ষত সোনার হরিণ চাকরি ছেড়ে রাজনৈতিক জীবন ও লেখালেখিকে জীবনের করণীয় হিসেবে বেছে নেন বদরুদ্দীন উমর। এই জীবনে তাঁর সঙ্গী সুরাইয়া হানম, দুই মেয়ে সারা আখতার বানু ও মাসিহা আখতার বানু ফালুদা এবং ছেলে সোহেল আব্দুল্লাহ’্র ভূমিকা পুরোটা জানা না থাকলেও আঁচ করতে পারি। আঁচ করতে পারি তাঁদের গুরুত্ব কোনো অংশে কম ছিল না। বদরুদ্দীন উমর লিখে আয় করতেন আর সুরাইয়া হানমের দীর্ঘদিনের উত্তরা ব্যাংকে ও পরে আইন সালিশ কেন্দ্রে চাকরিতে সংসার সামলে উঠতো। সংসারে কেবল আর্থিক হালধরা ছাড়াও বদরুদ্দীন উমরের রাজনৈতিক জীব-যাপনের লড়াইয়ে পর্দার আড়ালে নিঃসন্দেহে সুরাইয়া হানমেরও জরুরি অংশগ্রহণ ছিল। উমর ভাইয়ের ৯০তম জন্মদিনে সুরাইয়া হানমকে ধন্যবাদ এই লড়াইয়ে অংশ নেবার জন্য। স্মরণ করি আরো দুজনকেÑযারা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ২৫ বছরের বেশি সময় পাশে ছিলেন, তাঁদের একজন আনোয়ারা বেগম অন্যজন ফিরোজ আহসান। ফিরোজ আহসান শুধু সংগঠনের সহযোদ্ধা হিসেবে নন তাঁর পরিবারের সদস্যের মতোই পাশে ছিলেন। ফিরোজ আহসানের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম গত বছর করোনায় আমাদের ছেড়ে গেছেন।
জন্মদিনে সম্মাননা গ্রন্থ উদ্দেশ্যে বদরুদ্দীন উমরকে নিয়ে এ লেখা নব্বই দশকে সংগঠনে কাজ করারই অভিজ্ঞতা। তবে সামগ্রিকভাবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, কাজের পদ্ধতি, কোন কোন সমালোচনার বিষয় ও ধরনের সাথে অনেকের মতো আমারও যে মতপার্থক্য সেসব নিয়ে জরুরি লেখা প্রয়োজনীয় কর্তব্য মনে করি। যা নিয়ে অন্যত্র নিশ্চয়ই লেখার সুযোগ হবে। একইসাথে ভরসা রাখি ভবিষ্যতে তাঁকে নিয়ে আরো অনেক পর্যালোচনা ও গভীর গবেষণা করবে বর্তমান এবং আগামীর তরুণ প্রজন্ম। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ এবং ইতিহাস বুঝতে বদরুদ্দীন উমর, তাঁর কালপর্ব এবং ভূমিকা পর্যালোচনা ও পাঠ এড়াবার সুযোগ নেই। তরুণ প্রজন্মের কাঁধে অনেক দায়।
নব্বই দশকের তরুণ প্রজন্ম আমরা আর বর্তমানে একবিংশ দশকের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পার্থক্য আছে নিঃসন্দেহে। দেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশের প্রভাব বর্তমান মধ্যবিত্ত তরুণদের ওপর ব্যাপক। জীবিকার জন্য জীবন, পালিয়ে থাকা, লুকিয়ে থাকা, রেখে-ঢেকে হিসাব করে চলা ও মোহের হাতছানিতে ডুব দেওয়া, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জালে জড়িয়ে থাকা ইত্যাদি এখন তারুণ্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্যে রূপ দিতে পারঙ্গম শাসক শ্রেণি। ভয় এবং নতজানু রাজনৈতিক আবহ যেন গ্রাস করে ফেলেছে তারুণ্যের সাহস, মনোবল এমনকি স্বপ্ন দেখার বাসনাকেও। রাজনীতিতে অনিহা বর্তমানে তারুণ্যের বৈশিষ্ট্য হলেও নব্বই দশকের প্রজন্ম হিসেবে রাজনীতি ছিল আমাদের জন্য বেঁচে থাকার শক্তি, জীবনের কেন্দ্রে স্থান দেবার মতো বিষয় ও সাহস। এই সাহস সঞ্চারে অনেকের সঙ্গে বদরুদ্দীন উমরের নাম উল্লেখযোগ্য। নব্বই দশক এবং একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের তরুণদের মধ্যে ফারাক থাকলেও সম্ভাবনা এবং আশাবাদ আছে দুই প্রজন্মেই। দেশের কেন্দ্রে এবং প্রান্তে নানান আন্দোলনে ছাত্র ও শ্রমজীবী তরুণদের বর্তমান উপস্থিতি কোথাও কোথাও আশার ছটা হয়ে জ্বলছে। আমাদের অতীত ও বর্তমানের এ-সকল অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিতে আরো সক্রিয় হতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে, সেই ভরসাই করি।
মতপার্থক্য, ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও বদরুদ্দীন উমর রাজনৈতিক শিক্ষক এবং আত্মীয়ের মতো আপন একজন হয়ে আমাদের হৃদয়ে থাকবেন চিরকাল। উমর ভাই আমাকে তার প্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ব্যাইঠোফেন এবং মোসার্ট-এর দুটি সিম্ফনি রেকর্ড করে দিয়েছিলেন ১৯৯৬ কি ৯৭ সালের দিকে। ওই পুরনো ক্যাসেটের খাপে ও গায়ে তাঁর হাতে লেখা মোসার্ট এবং ব্যাইঠোফেন খুঁজে চালালাম আজ। ব্যাইঠোফেন বাজছে আর উমর ভাইকে স্মরণ করছি। তাঁর এই সঙ্গীতপ্রেম নিয়েও নানা ভাবনা জানার সুযোগ হয়েছিল। হয়তো অন্য কোনোদিন সেকথা বলা যাবে। বদরুদ্দীন উমরের জন্মদিনে তাঁর প্রতি আবারও শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাসহ আমার সামান্য নিবেদন শেষ করলাম।
৯ নভেম্বর ২০২১
লেখক: তাসলিমা আখতার: সভাপ্রধান, গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি : সদস্য, রাজনৈতিক পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন